Friday, May 7, 2021
Homeবাংলাদেশধর্মের নামে অধর্মের রাজনীতি

ধর্মের নামে অধর্মের রাজনীতি

মতামত: ওমর ফারুক রায়হান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ম্যানেজমেন্ট)।।

ধর্মের নামে রাজনীতিতে বরাবর-ই অধর্মের স্বীকার হয়েছি আমরা। ভাষা, শিল্প-সংস্কৃতি, সাহিত্য, খাদ্যাভ্যাসে কোন মিল না থাকা সত্বেও ১৯৪৭ সালে হাজার মাইল দূরত্বের দুটি ভূখণ্ডকে একসাথে জুড়ে দেয়া হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। সাম্প্রদায়িক দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ বাঙালির জীবনে সুখ বয়ে আনতে পারেনি। রাজনৈতিক বৈষম্য, ভাষাগত বৈষম্য, শিক্ষাখাতে বাজেট প্রণয়নে বৈষম্য, চাকরীর বাজারে বৈষম্যের স্বীকার হয়ে যখন-ই বাংলার মানুষজন ন্যায্য অধিকার চেয়েছে, স্বাধীনতা চেয়েছে তখন-ই পশ্চিম পাকিস্তানি ও তাদের বাঙালি দোসররা ইসলাম গেল, পাকিস্তান গেল বলে মায়াকান্না শুরু করেছে। যারা ধর্মের কথা বলে অধর্ম করছে, তারা আমাদের আপনজন নয়, এটি বুঝতে বাঙালিদের খুব বেশি সময় লাগেনি।

১৯৭১ সালে ৩০ লাখ শহীদের তাজা প্রাণ, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে সাম্প্রদায়িক সেই অপশক্তিকে-ই সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পরাজিত করে লাল-সবুজের পতাকার মালিকানা পেয়েছি আমরা। দেশ স্বাধীন হবার পর, ১৯৭২ সালের ১০-ই জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ব্যাঙ্গাত্মক প্রতিবাদের সুরে সেই অপশক্তিকে-ই জিগ্যেস করেছিলেন, “আমরা মুসলমান? মুসলমান মা বোনদের রেপ করে? আমরা মুসলমান?” সেদিনের ভাষণে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। বাংলাদেশে থাকবে সমাজতন্ত্র ব্যবস্থা।

আর কেউ যেন ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, ধর্মের নামে কেউ যেন ব্যবসা করতে না পারে, ধর্মের নামে কেউ যেন নিপীড়ন, নির্যাতন, বৈষম্য করতে না পরে সেই লক্ষ্যে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে সংবিধানের মূলনীতি করেন বঙ্গবন্ধু। ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, “ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমান মুসলমানের ধর্ম পালন করবে। হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে। খ্রিস্টান তার ধর্ম পালন করবে। বৌদ্ধও তার নিজের ধর্ম পালন করবে। কেউ কারো ধর্ম পালনে বাধা দিবে না। এর একটা মানে আছে। এখানে ধর্মের নামে ব্যবসা চলবে না। ধর্মের নামে রাজনীতি করে রাজাকার আলবদর পয়দা করা চলবে না। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে দেয়া হবে না”।

উইকিপিডিয়াতে সেকুলারিজমের তর্জমা পড়ে এসে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অনেকে-ই হারাম বলে চালিয়ে দিতে চায় কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা ভাবনাকে ভুল প্রমাণিত করতে পারে না কেউ। ১৯৭৫ সালের ১৫-ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অন্যতম ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধান থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল। ২০১০ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ের বাঁকে বাঁকে বাংলার মানুষ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কালো চেহারা দেখেছে। বিএনপি-জামাত জোটের নারকীয় কর্মকাণ্ড বাংলার মানুষ এত সহজে ভুলে যাবে না। ২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসে। সে সময় থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত শুধুমাত্র রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারান ৮৭২ জন। এর মধ্যে সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে আওয়ামিলীগের ২০০ নেতা কর্মীকে হত্যা করা হয়।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় প্রাণ হারান ২৪ জন। স্বাধীনতার প্রকাশ্য বিরোধিতা করা জামাতের সাথে জোট বেঁধে ২০ বছর যাবৎ রাজনীতি করেছে বিএনপি। সম্প্রতি তাদের শুভ বোধের উদয় হয়েছে। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি জামাতকে দলে আশ্রয় দিয়ে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। বিএনপির সাথে জোট বেঁধে রাজনীতি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামাত। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে যদি সাংবিধানিকভাবে গনবিরোধী সাম্প্রদায়িক দল জামাতের রাজনীতি পুরপুরিভাবে বাংলার মাটিতে নিষিদ্ধ করা যায় তাহলে এটি-ও হবে শহীদের রক্তের ঋণের প্রতি দায়বদ্ধতা পালন। ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এখনো একাত্তরের পরাজিত শক্তি বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক পতাকাকে খামচে ধরার চেষ্টা করছে। কার্ল মার্কস বলেছিলেন, “এটাও ইতিহাসের শিক্ষা যে কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না”।

বাংলার বুকে ধর্মের নামে অধর্ম করে কেউ কোনদিন পার পাইনি ইতিহাসের এই শিক্ষা হেফাজত নেয়নি। সম্প্রতি তারা মোদি বিরোধী আন্দোলনের নামে দেশব্যাপী ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর মোড়ালে আগুন, নামফলক ভাংচুর করে তারা প্রমাণ করেছে, শেখ মুজিবের তর্জনীতে পদ্মার পলিদ্বীপের অভিধানে যোগ হওয়া অবিশ্বাস্য শব্দ স্বাধীনতা তারা মেনে নেয়নি। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে হয়তো তাদেরও ব্যাঙ্গাত্মক প্রতিবাদের সুরে জিগ্যেস করতেন, ” আমরা মুসলমান? মুসলমান দেশের সম্পদ নষ্ট করে? অন্য ধর্মের মানুষের ঘরবাড়ি ভাংচুর করে? আমরা মুসলমান?” আমাদেরকে পূর্বপুরুষের রক্তে রঞ্জিত বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল হার না মানা ইতিহাসের চেতনা নিজেদের মধ্যে ধারণ করতে হবে। দেশের তরে অকাতরে প্রাণ দিয়ে যাওয়া শহীদের আত্মত্যাগ ভুলে গেলে চলবে না। ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পরিহার করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ধর্মীয় সম্প্রীতির সুরে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের গান গাইতে হবে।মনে রাখতে হবে, ধর্মের নামে অধর্মের কাছে বাংলাদেশ আগেও হারেনি, আজও হারবে না। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পানে এই বাংলার নির্ভীক এগিয়ে চলা কেউ থামিয়ে দিতে পারবে না!

For More News: https://nittosongbad.com

Follow our Facebook : http://facebook.com/nittosongbad

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular