Saturday, June 19, 2021
Homeজানা অজানাঅপারেশন মস্কো থিয়েটার-operation Moscow theater

অপারেশন মস্কো থিয়েটার-operation Moscow theater

অপারেশন মস্কো থিয়েটার – সশস্ত্র বিদ্রোহীদের হাতে নয়, বরং উদ্ধারকারী কমান্ডো দলের ভুলেই যখন প্রাণ হারিয়েছিল শতাধিক জিম্মি!


২৩ অক্টোবর ২০০২, রাত ৯টা। রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর প্রসিদ্ধ ডুবরোভকা থিয়েটারে চলছিল ‘Nord-Ost’ গীতিনাট্য। অডিটোরিয়ামভর্তি হাজারখানেক দর্শক। নাটকের দ্বিতীয় অঙ্ক কেবল শুরু হয়েছে, এমন সময় কালাশনিকভ রাইফেলের একটানা ফায়ারিংয়ে সবাই চমকে ওঠে৷ প্রায় ৪০ জন সশস্ত্র যোদ্ধা মুহূর্তেই সকলকে জিম্মি করে ফেলে৷ তাদের সাথে ছিল ১৮টি কালাশনিকভ রাইফেল, ২০টি পিস্তল, শতাধিক গ্রেনেড, তিনটি বড় বোমা আর প্রায় ১০০ কেজির মতো বিস্ফোরক। যোদ্ধাদের অনেকের গায়েই লাগানো ছিল বিস্ফোরকগুলো।


কিংকর্তব্যবিমূঢ় দর্শকেরা একসময় বুঝতে পারেন, তাদেরকে জিম্মি করা হয়েছে। যোদ্ধারা তাদেরকে নির্দেশ দেয় মাথা নিচু করে নিজ নিজ আসনে বসে থাকতে। মঞ্চের পেছনে থাকা ৯০ জন নাট্যকর্মী অবশ্য জিম্মিদশা থেকে পালিয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। বাকি প্রায় ৯০০ দর্শক তখন সশস্ত্র যোদ্ধাদের হাতে জিম্মি।


এই সশস্ত্র যোদ্ধারা ছিল চেচেন বিদ্রোহী। ককেশাস অঞ্চলের মুসলিমপ্রধান চেচনিয়ায় তখন রাশিয়ান সেনাবাহিনীর সাথে চেচেন বিদ্রোহীদের যুদ্ধ চলছিল, যেটি দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধ নামে পরিচিত। থিয়েটারে দর্শকদের জিম্মি করা যোদ্ধাদের দাবি ছিল, তৎক্ষনাৎ চেচনিয়া থেকে সকল রাশিয়ান সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে৷ তা না হলে এই জিম্মিদের হত্যা করা হবে।
যোদ্ধারা দর্শকদের জানায়, তারা শুধুমাত্র রাশিয়ান নাগরিকদেরকে জিম্মি করবে, কাজেই কোনো বিদেশি নাগরিক থাকলে প্রমাণ দেখিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। এরপর বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিক ছাড়া পান। শুধু তাই নয়, তারা রাশিয়ান নাগরিকদের মধ্যেও শিশু, অসুস্থ বা গর্ভবতী নারীদেরকে যেতে দেয়। সেই রাতেই প্রায় ২০০ জনকে তারা ছেড়ে দেয়। বাকিরা জিম্মি থাকে।


কিন্তু অন্য সশস্ত্র যোদ্ধাদের সাথে চেচেন বিদ্রোহীদের পার্থক্য ছিল এই যে, তারা কোনো জিম্মির সাথে খারাপ আচরণ করেনি বা কাউকে আঘাত করেনি। তাদেরকে বাইরে ফোন করে আত্মীয়স্বজনের সাথে কথাও বলতে দিয়েছে। এমনকি রেডক্রসের সদস্যদেরকে মেডিকেল কিট নিয়ে জিম্মি নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য ভেতরে প্রবেশও করতে দিয়েছে। মোটকথা, চেচেন যোদ্ধারা জিম্মিদের প্রতি মোটেও প্রতিকূল ছিল না। তবে তারা বারবার হুমকি দিচ্ছিল যে তাদের দাবি মেনে না নিয়ে যদি সরকারি বাহিনী তাদের ওপর আক্রমণ করতে আসে, তাহলে সব জিম্মিকেই তারা হত্যা করবে।
পরের দুদিন, ২৪ ও ২৫ অক্টোবর চেচেন বিদ্রোহীদের সাথে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের কয়েক দফায় আলোচনা চলে। রাশিয়া সরকার তাদেরকে এ পর্যন্তও বলে যে জিম্মিদের ছেড়ে দিলে তাদেরকেও আর গ্রেফতার করা হবে না। কিন্তু যোদ্ধারা তাদের দাবি থেকে সরে আসেনি।

তারা জানায়, তারা মরতেই এসেছে, কিন্তু মৃত্যুর আগে দাবি আদায় করে তবেই তারা যাবে। এরই মধ্যে ২৪ অক্টোবর তারা আরো ৩৯ জন এবং ২৫ অক্টোবর ১৯ জন জিম্মিকে ছেড়ে দেয়। এই দুদিনে অবশ্য কয়েকজন জিম্মি পালানোর চেষ্টা করায় ভেতর থেকে গোলাগুলির শব্দও শোনা যায়।


২৫ অক্টোবর রাতে নিশ্চিত হয়ে যায় যে আলোচনা ব্যর্থ হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে রাশিয়ান স্পেতসনাজ কমান্ডোরা প্রস্তুত হয় থিয়েটারে রেসকিউ অপারেশন চালানোর জন্য। থিয়েটারের ভেতর সশস্ত্র যোদ্ধারা টিভিতে সার্বক্ষণিক খবরাখবর দেখছিল। তাই তাদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য প্রচার করা হয়, ২৬ অক্টোবর ভোর ৩টায় স্পেতসনাজ কমান্ডোরা অপারেশন শুরু করবে।

তা শুনে তিনটার আগে থেকেই যোদ্ধারা প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। কিন্তু চারটার পরও যখন কমান্ডোরা আসেনি, তখন তারা আবার আগের মতো হালকা মেজাজে চলে আসে।
এটা আসলে ছিল কমান্ডোদের চাল। তারা জানতো নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলে যোদ্ধারা আর তেমন সতর্ক থাকবে না। তারা যোদ্ধাদেরকে ২৬ অক্টোবর ভোর তিনটায় অপারেশন শুরুর কথা বললেও নিজেরা অপারেশনে নামে দু’ঘন্টা পর, পাঁচটায়। যাই হোক, অপারেশন শুরুর আগে তারা যোদ্ধাদেরকে অচেতন করার উদ্দেশ্যে গ্যাস ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তই পরে কাল হয়ে দাঁড়ায়।


রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে কখনো প্রকাশ করেনি তারা এনেস্থেসিয়া হিসেবে ঠিক কোন গ্যাসটি ব্যবহার করেছিল। এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেমের মধ্য দিয়ে গ্যাসটি অডিটোরিয়ামে প্রয়োগ করার আধঘন্টার মধ্যেই যোদ্ধা এবং জিম্মিসহ প্রায় সবাই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে। অবশ্য যোদ্ধারা অজ্ঞান হওয়ার আগে বুঝতে পেরেছিল যে সরকারি সৈন্যরা আসছে, তাই তারা তখনই মেইন গেইটের দিকে গুলি ছুঁড়তে শুরু করেছিল। তবে কোনো জিম্মিকে তারা কিছু করেনি।
আধঘন্টা পর স্পেতসনাজ কমান্ডোরা অডিটোরিয়ামের ভেতর ঢুকে ৪০ জন যোদ্ধার সবাইকেই হত্যা করে। অবশ্য যোদ্ধাদের মধ্যে মাত্র অল্প কয়েকজনই তখন জেগে ছিল কমান্ডোদের মোকাবিলা করার জন্য। বাকি প্রায় সবাই তখন চেতনাহীন, ওই অবস্থাতেই কমান্ডোদের গুলিতে তারা প্রাণ হারায়।


কিন্তু তারপরই ঘটে মর্মান্তিক ঘটনাটি। যোদ্ধাদেরকে অচেতন করতে যে গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছিল, তার মাত্রা সম্ভবত সহ্যসীমার চেয়ে বেশি দেওয়া হয়েছিল। ফলে জিম্মি নাগরিকরাই এবার একেকজন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে থাকে। তিনদিন ধরে বন্দী থেকে সশস্ত্র যোদ্ধাদের হাতে তারা বলতে গেলে নিরাপদই ছিল, অথচ তাদেরকে উদ্ধার করতে আসা সৈন্যদের ভুলেই তারা প্রাণ হারাতে থাকে।


জিম্মিদের উদ্ধারের পর হাসপাতালে নেওয়া হলেও রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ কোনো এক অজানা কারণে ডাক্তারদের কাছেও প্রকাশ করেনি ঠিক কোন গ্যাসটি তারা প্রয়োগ করেছিল। ফলে ডাক্তাররাও সঠিক চিকিৎসাও দিতে পারেননি। এতে সব মিলিয়ে ১৩০ জন জিম্মি প্রাণ হারায়। তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজনের মৃত্যু গোলাগুলিতে হয়েছিল বটে, কিন্তু বেশিরভাগেরই মৃত্যুর কারণ ছিল কমান্ডোদের প্রয়োগকৃত বিষাক্ত গ্যাস। আরো ৭ শতাধিক জিম্মি গ্যাসক্রিয়ায় মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।


রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের এমন অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তে সমালোচনা হয় সবখানেই। এতকিছুর পরও তারা কখনো স্বীকার করেনি যে কোন গ্যাসটা তারা ব্যবহার করেছিল। যদিও কেমিক্যাল বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন যে ফেন্টানিল নামে একটি গ্যাস হয়তো ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে, যা মরফিনের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী।
চেচেন যোদ্ধাদের হাতে জিম্মি থাকাবস্থায় মানুষগুলোর মৃত্যু হয়নি, অথচ তাদেরকে বাঁচাতে গিয়ে রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ যে উল্টো মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল, এমন হঠকারী সিদ্ধান্তকে হয়তো বিরল বললেও কম বলা হয়।
কালেক্টেড

FACEBOOK: http://facebook.com/nittosongbad.com

More news: আমে পোকা হয় কিভাবে? মুসলিম হত্যা তাও আরেক মুসলিম দেশ দ্বারা- ব্লাক সেপ্টেম্বর মুসলিম বাহিনীর বদরের যুদ্ধ জয়লাভ

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular