Take a fresh look at your lifestyle.

নবজাতক শিশুর জন্ডিস ও প্রতিকার ব্যাবস্থা

0

স্বাস্থ্য মূল সম্পদ। প্রত্যেকের স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া আবশ্যক। বিশেষ করে নবজাতকের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা জীবনের এই প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে তা পরবর্তী জীবনকে প্রভাবিত করবে। নবজাতকের স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো অন্যতম একটি জন্ডিস।

নবজাতকের জন্ডিসঃ

অধিকাংশ নবজাতকের জন্ডিস হতে পারে। আর তা নিয়ে তাদের মা-বাবা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের চিন্তার শেষ নেই। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জন্ডিস ক্ষতিকর নয়। নবজাতকদের জন্মের প্রথম চার সপ্তাহ বা ২৮ দিন বয়স পর্যন্ত সময়কালকে নিউনেটাল পিরিয়ড বলা হয় এবং এই বয়সের সব শিশু নবজাতক হিসেবে পরিচিত। জন্ডিস বলতে যা বােঝায় শরীরের চামড়া (স্কিন) এবং ভেতরের আবরণ বা চোখের সাদা অংশ (স্কেলবা) হলদু বর্ণ ধারণ করাকে জন্ডিস বলা হয়। রক্তের বিলুরুবিন নামক একটি উপাদান অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেলেই জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দেয়। প্রায় সকল নবজাতক শিশু তার জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই জন্ডিস রোগের শিকার হয়ে থাকে। কোন কোন শিশুর ক্ষেত্রে এর মাত্রা কম, আর কারো কারো ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি হয়। সাধারণত নবজাতকের শরীরে হলুদ পিগমেন্ট বা বিলুরুবিনের গঠন হয়তো বেশি বলেই এই জন্ডিস দেখা দেয়। বিলুরুবিনের মাত্রা বেশি হয়ে গেলে তা শিশুর ছোট্ট শরীর এর গঠন সহ্য করতে পারে না আর তা শরীরে হলুদ আকার হিসেবে ধারন করে এবং শিশু জন্ডিসে আক্রান্ত হয়। শিশুর লিভার ধীরে ধীরে বেড়ে উঠলে এই জন্ডিস সেরে যায়। তবে জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জন্ডিস হলে তা কখনও স্বাভাবিক নয়। জন্ডিস তখনি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে পড়ে যখন এর মাঝে অন্য কোন শারীরিক সমস্যা শুরু হয়। যেসব শিশুরা
নির্ধারিত সময়ের পরে জন্মগ্রহণ করে তারাই সাধারণত এই সমস্যার শিকার হয়ে থাকে কারণ তাদের শরীর পূর্ণাঙ্গ সময়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের চেয়ে বেশি দুর্বল হয়। বিলুরুবিন বেশি মাত্রায় থাকলে তা মারাত্বক জন্ডিসে রূপ নেয় আর তা শিশুর স্বাভাবিক মস্তিষ্ক গঠনে বাঁধা দেয়।

কিভাবে বুঝবেনঃ

আপনার শিশু জন্ডিসে আক্রান্ত হয়েছে কিনা, তা বুঝতে শিশুর হাতের তালু খেয়াল করতে হবে। জন্ডিসে আক্রান্ত হলে, তালু হলুদাভ হয়ে যায়। এছাড়াও শিশুর মুখ, হাত ও বুক বা পেটের ওপর পর্যন্ত হলুদাভ হয়ে যায়। সেই সাথে মলের রং সবুজ হয়ে যেতে পারে। শিশুর গায়ের রং পরিবর্তন হলে তার রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা পরীক্ষা করার মাধ্যমে জন্ডিসে আক্রান্ত নিশ্চিত হওয়া যায়।

নবজাতকের জন্ডিসের কারণঃ

বিভিন্ন কারণে নবজাতক শিশুর জন্ডিস হতে পারে নবজাতক শিশুর জন্ডিস আবার নানা ধরনেরও হতে পারে। এগুলোর কারণও ভিন্ন ভিন্ন। যেমন –

ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিসঃ

সদ্যোজাত শিশুদের বিলুরুবিনের পরিমাণ খুব বেশি থাকে। কেননা যকৃতের যে উৎসেচক বা এনজাইমগুলোরবিলুরুবিন নিয়ন্ত্রণ করার কথা, সেগুলো শিশুর জনের অব্যবহিত পরেই তাদের কাজ ঠিকমত শুরু করে উঠতে পারে না। এটাই ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিসের কারণ । বাচ্চার যখন তিনদিন বয়স, তখনই এর শুরু। কখনো আবার দুদিনের মাথায় ও এটা হতে পারে। সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে এটা আপনা থেকেই ঠিক হয়ে যায়।

রোগবৃত্তান্তঃ

নবজাতকের এই জন্ডিস সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এর জন্য দায়ী শিশুর তুলনামূলকভাবে লিভারের অপরিপক্ব কার্যক্রম। যেসব নবজাতক পূর্ণগর্ভকাল নিয়ে ভূমিষ্ঠ । হয়েছে, তাদের প্রায় ৬৫ শতাংশ আর যেসব নবজাতক অকালজাত তাদের প্রায় ৮০ শতাংশের এ ধরনের জন্ডিস দেখা যায়। সিরাম বিলরুবিনের মাত্রা  সাত মিলিগ্রাম /ডেসিলিটারের বেশি হলে জন্ডিস খালি চোখে নবজাতক শিশুর ক্ষেত্রে নির্ণয় করা যায়। দু-তিন দিন বয়সে শুরু হয়ে দৈনিক এক থেকে পাঁচ গ্রাম /ডেসিলিটার করে কমে আসে। ১০ দিন বয়সের দিকে লোপ পায়। বস্তুত নবজাতকের এই জন্ডিস সাধারণ ধরনের বা নির্দোষ জন্ডিসও বলা যায়। তবে এর মাত্রা কিছু কারণে বেড়ে যেতে পারে বা দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারে। যেমনঃ
শিশু-
১.নির্ধারিত সময়ের আগে ভূমিষ্ট হলে
২.জন্মকালীন স্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা
৩.অ্যাসফেকশিয়া হলে।
৪.শরীরে শীতলতা (হাইপোথারমিয়া) হলে
৫.রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কম হলে।
৬.মাথায় আঘাতজনিত কারণে রক্তপাত হলে।
৭.পলিমাইথেমিয়া হলে
৮.গলগণ্ডের সমস্যা হলে (হাইপােথাইরয়েডিজম)।
৯.নানা সংক্রমণ হলে।

কী করতে হবেঃ

নবজাতকের এ ধরনের জন্ডিস যেমন সচরাচর তেমনি নির্দোষ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেরাম বিলুরুবিন পরীক্ষা করানো ছাড়া তেমন বিশেষ পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। তবে মনে রাখতে হবে, ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস নির্ণয়  করা হয় নবজাতক শিশুতে জন্ডিসের জন্য দায়ী অন্যান্য রোগ যে জড়িত নেই, তা নিশ্চিত হওয়ার পর। আর তা  নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে কখনো বা প্রস্রাবের কালচার,  রক্তের গ্রুপ, কুমবস টেস্ট, টোটাল ও কনজুমেইটেড  বিলুরুবিন, গেলাকটোসেমিয়া প্রভৃতি পরীক্ষা করার
প্রয়োজন হতে পারে। জন্ডিস হওয়া নবজাতক একটু  বেশি তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকে ফলে দুধ কম পান করে। ফলে  পানিস্বল্পতায় আক্রান্ত হয়ে জন্ডিসের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তাই এ সময়টাতে ঘন ঘন বুকের দুধ পান করানো  জরুরি। জন্ডিসের মাত্রাধিক্যের কারণে বিশেষত  অকালজাত কিংবা অন্য কোনো জটিলতাপূর্ণ নবজাতকের জন্ডিসের মাত্রা নিরাপদ স্তরে থাকতে  থাকতেই কখনো কখনো ফটোথেরাপি গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে।

ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিসঃ

বাচ্চাদের আরেক ধরনের জন্ডিস হলো ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস। মায়ের দুধে বিদ্যমান বিশেষ হরমানেও শিশুর শরীরে বিলুরুবিনের মাত্রা খুব বেশি বৃদ্ধি করতে পারে। ফলে নবজাতকের জন্ডিস হয়। শিশুকে বুকের দুধ দিলে  বা শালদুধ না খাওয়ালেও প্রথম সপ্তাহে জন্ডিস দেখা দিতে পারে। মাঝে-মধ্যে এ ধরনের জন্ডিস এক থেকে  দুমাস এটা থাকে। শিশু হাসপাতালে থাকার সময়ে এটা ধরা পড়লে অতিবেগুনি রশ্মি বা আলট্রা ভায়ালেট এর  নিচে তাকে রাখা হয়। অনেক সময় অবশ্য বাচ্চা বাড়ি
চলে যাওয়ার পর এই জন্ডিস ধরা পড়ে। সেক্ষেত্রে সূর্যের আলোয় বাচ্চাকে শুইয়ে রাখতে বলা হয়।

রেশাস ইনকমপ্যাটিবিলিটিঃ

বাচ্চাদের জন্ডিসের মধ্যে সবচেয়ে জটিল হলো রেশাস। ইনকমপ্যাটিবিলিটি। মায়ের রক্তের গ্রুপের সঙ্গে শিশুর রক্তের গ্রুপ না মিললে অনেক সময় এই জন্ডিস শিশুর। দেহে দেখা দেয়। যেমন মায়ের রক্তের গ্রুপ এ নেগেটিভ এবং শিশুর গ্রুপ এ পজেটিভ হলে অথবা মায়ের গ্রুপ এ পজেটিভ এবং শিশুর গ্রুপ এ বা ও নেগেটিব। এতে শিশুর রক্তের লোহিত কণিকা ভেঙে রক্তে বিলুরুবিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং তা যদি অতি তীব্র মাত্রায় পৌছে অর্থাৎ ১০০ মিলি রক্তে ২০ মিলিগ্রামের বেশি পরোক্ষ
বিলুরুবিন হয়, তবে মস্তিষ্কের বিশেষ অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। যদি শিশু বেঁচেও যায় ভবিষ্যতে শিশুর বুদ্ধিমত্তা, চলাফেরা শ্রবণ, দৃষ্টি, শিক্ষা ও আচরণগত ত্রুটি দেখা দিতে পারে। জন্মের দিন থেকেই বাচ্চার এই জন্ডিস হয় এবং সেদিন থেকেই এর চিকিৎসা শুরু হওয়া দরকার। গর্ভাবস্থায় আগে থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করালেই কিন্তু বাচ্চা জন্ম গ্রহনের আগেই বোঝা সম্ভব, তার এ ধরনের জন্ডিস হবে কিনা। সেক্ষেত্রে চিকিৎসার সুবিধা হয়। এমনিতে এই জন্ডিস কমের মধ্যে থাকলে ফোটোথেরাপি দিয়েই সারানো সম্ভব। তা না হলে জন্ডিসের অবস্থা খুব বেশি হলে শেষ বিকল্প হিসেবে ব্লাড ট্রান্সফিউশন দরকার হয়। বাচ্চা পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়া হয় না। বাড়িতে থেকে এই জন্ডিসের
চিকিৎসা সম্ভব নয়।

অবস্ট্রাকশনঃ

অবস্ট্রাকশন বা শরীরের কোথাও কোনো বাঁধা থাকলে তা থেকে যে জন্ডিস হয়, বাচ্চাদের বেলায় সেই জন্ডিস কিন্তু মারাত্মক। কারণ এটা প্রথমে হঠাৎ বোঝা যায় না। ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিসের সঙ্গে এই জন্ডিসের পার্থক্য নিরূপণ করা মুশকিল। কিন্তু ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস ১০ দিনের মধ্যেই সেরে যাওয়ার কথা। যদি এরকম হয়, দু’সপ্তাহের মধ্যে জন্ডিস সারছে না, তাহলে দেরি না করে ডাক্তারের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করান। অবস্ট্রাকশনের দরুন জন্ডিস হলে বাচ্চার পায়খানার রং সাদা হবে।
তাছাড়া গায়ের রং ও একটু বেশি হলুদ হতে পারে। মনে রাখবেন, এই জন্ডিস শিশুর এক থেকে দেড় মাস বয়সের মধ্যে ধরা পড়া খুব জরুরি। কারণ সে সময়ের মধ্যেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ওই অবস্ট্রাকশন, যার জন্য জন্ডিস হচ্ছে, তা সরিয়ে
ফেলতে হবে। এটা নিয়মের ব্যতিক্রম বলেই ধরে নিতে হবে।

অন্যান্য কারণেঃ

আরো কিছু কারণে জন্ডিস হতে পারে। যেমনঃ হাইপোথাইরয়েডের জন্যও জন্ডিস হয়। জন্মের পাঁচ থেকে সাত দিনের মাথায় এটা হয়। হাইপোথাইরয়েডের জন্ডিস দেরি করে শুরু হয়, দেরি করে শেষ হয়। আবার প্রি-ম্যাচিওর বেবি এবং ছোট সাইজের বাচ্চাদের মধ্যে জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। উল্লেখ্য এ বি সি এ- সব ধরনের জন্ডিসই বাচ্চাদের হতে পারে। ‘সি’ আর ‘ই’ ধরনের জন্ডিস খাদ্য এবং পানীয় থেকে সংক্রমণের ফলেই সাধারণত হয়। আর হেপাটাইটিস ‘বি’ বিভিন্ন কারণে হতে পারে। মায়ের তা থাকলে বাচ্চা জন্মের সময়ই ‘বি’ টাইপ জন্ডিসের সংক্রমণে আক্রান্ত হতে পারে। তাছাড়া বাচ্চার শরীরে রক্ত দিলে হাসপাতাল থেকে বিভিন্ন সংক্রমণের ফলেও এটা হতে পারে। হেপাটাইটিস ‘বি’র ভ্যাকসিন বা টিকা আছে। হেপাটাইটিস সি’র সেরকম কিছু নেই। তাই এটা খুব ভয়ের। আবার অনেক সময় এক-দু’বছরের বাচ্চাদের জন্ডিস যে হয়েছে, তা বোঝা যায়। ‘এ’ বা ‘ই’ টাইপ জন্ডিস হলে সেরকম ঝামেলা হয়তো হবে না; কিন্তু এরকম অজান্তে যদি বি বা সি টাইপ জন্ডিস হয়, তাহলে কিন্তু প্রাণসংশয়ও হতে পারে।

চিকিৎসাঃ

শিশুর রক্তে বিলুরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে শিশুকে ফটোথেরাপি বা আলোকে চিকিৎসা দেয়া হয়। এই পদ্ধতির উপকারিতা বা কার্যকারিতা নিয়ে মতভেদ থাকলেও এখনও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। আর প্রাকৃতিকভাবে শিশুকে আলোকে চিকিৎসা দেয়ার জন্য, প্রতিদিন আধা ঘন্টার জন্য রোদ পোহাতে বলা হয়। তবে সূর্যের কড়া রোদ ও অতিবেগুনি রশ্মি শিশুর ত্বকের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই সময় আর রোদের প্রভাব। দেখে শিশুকে রোদ পোহাতে দিতে হবে।

জন্ডিস হলে বুকের দুধ খাওয়ানো যাবে কি?

কোনো অবস্থায়ই নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ানো থেকে বিরত রাখা যাবে না। শিশুকে নিয়মিত দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর পর বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। বিশেষ করে ফিজিওলজিক্যাল বা স্বাভাবিক জন্ডিসের মূল চিকিৎসাই হচ্ছে শিশুকে ঠিকমতো বুকের দুধ খাওয়ানো।

Leave A Reply

Your email address will not be published.