Take a fresh look at your lifestyle.

জন্মদিন উৎযাপনের ইতি বৃত্তান্ত

0

প্রাচীন মিসরে ফেরাউনরা যেদিন থেকে সিংহাসনে আরোহন করতো, সেদিন থেকে তাদের ‘দেবতা’ হিসেবে গণ্য করা হতো। এছাড়াও ফেরাউনদের ‘সূর্যদেবতার সন্তান’ মনে করতো সে সময়ের মিসরীয় অধিবাসীরা। মনে করা হতো, সিংহাসনে আরোহনের দিন ‘দেবতা’ হিসেবে পুনর্জন্ম হয় তাদের। এটা প্রায় ৫ হাজার বছরে আগের, অর্থাৎ ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বের কথা। ফেরাউনদের এই কথিত ‘পুনর্জন্মকে’ প্রকৃত জন্মের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হতো। তাদের সিংহাসনে আরোহনের দিনকে খুব জাঁকজমকপূর্ণভাবে ‘জন্মদিন’ হিসেবে উদযাপন করা হতো। ইতিহাসবিদদের মতে, ‘জন্মদিন’ উদযাপন কিংবা পালনের প্রথা সেখান থেকেই শুরু। যদিও তখন সাধারণ মানুষের ‘জন্মদিন’ পালন করা হতো না। এটা নির্ধারিত ছিল কেবল তাদের কথিত দেবতার জন্য। অগ্নিপুজারী প্রাচীন পারস্য সংস্কৃতিতেও জন্মদিন পালনের প্রথা পাওয়া যায়। এরপর ‘জন্মদিন’ উদযাপনের ইতিহাস পাওয়া যায় প্রাচীন গ্রিক সংস্কৃতিতে। গ্রিকরা মনে করতো, প্রত্যেক মানুষের একটি আত্মা আছে এবং সেটা জন্মদিনের সময় এসে উপস্থিত হয় (অন্য সময় অবশ্য আত্মা কোথায় থাকে, সে সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না)। ইতিহাসবিদদের মতে, গ্রিকরা মূলত প্রাচীন মিসরীয় সংস্কৃতিটিই ভিন্ন রূপে ধারণা করেছিল। তারাও কেবল বিশেষ ব্যক্তিদের জন্মদিন পালন করতো। প্রাচীন গ্রিক সংস্কৃতিতে বিপুল পরিমাণ দেব-দেবীর উপস্থিতি পাওয়া যায় এবং গ্রিকরা তাদের ক্রুদ্ধ দেব-দেবীদের শান্ত করতে বিভিন্ন ধরনের প্রাণি উৎসর্গ করতো। এমনকি মানুষও। এর মধ্যে চন্দ্রদেবী আর্তেমিসও ব্যতিক্রম ছিলো না। গ্রিক পুরাণে তাকে খুশি করতে নরবলি দেয়ার ঘটনা আছে। ক্রুদ্ধ আর্তেমিসকে সন্তুষ্ট রাখতে তাই গ্রিকরা জন্মদিনে একটা নতুন নিয়ম চালু করলো। এ উপলক্ষে তারা চাঁদের আকৃতিতে গোল করে কেক বানাতো এবং চাঁদের প্রতীকী আলো হিসেবে তার চারপাশে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিতো। এরপর সেগুলোকে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিতো, আর মনে করা হতো, এরমধ্য দিয়ে তাদের ‘শুভকামনা’ দেবীর কাছে পৌঁছে গেছে! এরপর গ্রিসের এই সংস্কৃতি রোমান সভ্যতায় জায়গা করে নেয়। অবশ্য মোটাদাগে আলাদা করে রোমান সভ্যতা বলে কিছু নেই। গ্রিক সভ্যতা এবং খিস্টধর্মের একটা সংমিশ্রণকেই আমরা এখন রোমান সভ্যতা বলছি। রোমানদের সময়েই প্রথমে এসে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্মদিন পালন শুরু হয়। কারও বয়স ৫০ বছর হলে তার জন্য বিশেষ কেক তৈরি করে দিনটি উদযাপন করা হতো। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, রোমানরা শুধু পুরুষের জন্মদিন পালন করতো। এর কারণ, রোমানদের সময়ে সমাজে নারীদের দেখা হতো দ্বিতীয় শ্রেণির জীব হিসেবে। মানবিক মর্যাদার দিক থেকে তারা কখনো পুরুষের সমকক্ষ ছিল না। এ কারণে ১২ শতকের আগ পর্যন্ত নারীদের জন্মদিন পালনেরও কোনও ইতিহাস পাওয়া যায় না। যদিও রোমানরা জন্মদিনের সংস্কৃতি চালু করেছিল, তবে তৎকালীন গির্জা একে পাপ হিসেবে দেখতো। যেহেতু এর সঙ্গে অনেক শিরক জড়িত ছিল, তাই খ্রিস্টধর্মে জন্মদিন পালন ছিল হারাম। তবে একটা সময়ে এসে গির্জা রাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করে। খ্রিস্টধর্মের বিকৃতি শুরু হয়। চতুর্থ শতকে এসে দেখা যায়, খ্রিস্ট ধর্মগুরুরাই তাদের যিশুর জন্মদিন পালন শুরু করে। একটা হারাম বিষয়কে তারা ফরজে পরিণত করে। জন্মদিনে কেক কাটার সংস্কৃতি গ্রিকরা চালু করলেও তখনকার কেক ছিল চাঁদের মতো সাদা। অনেক পরে বর্তমান সময়ের এই নানা রঙে রঙিন কেক চালু করে জার্মানরা। সেটা একদম ১৮ শতকের শেষ দিকে এসে। জন্মদিনের অনুষ্ঠানকে তারা বলতো Kinderfeste। মূলত শিশুদের জন্মদিনই বেশি পালন করতো জার্মানরা। এরপর শুরু এলো শিল্পবিপ্লব, অভিশপ্ত পুঁজিবাদ আর বাজার অর্থনীতির যুগ। এই অপ্রয়োজনীয় প্রথাটি তখন ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হলো। কারণ, এর সঙ্গে জড়িত ছিল ব্যবসা। একটা জন্মদিন উদযাপনকে কেন্দ্র করে তখন অনেক কিছু প্রয়োজন হয়ে পড়লো। ব্যবসায়ী-পুঁজিপতিদের জন্য মুনাফার একটি জায়গা হয়ে উঠলো ‘জন্মদিন’। পুঁজিবাদী দেশগুলো বিশ্বজুড়ে উপনিবেশ স্থাপন করলো। সেসব দেশে নিয়ে গেলো তাদের সংস্কৃতি। ছড়িয়ে দেয়া হলো। বোঝানো হলো, এটাই সভ্যতা। উপনিবেশায়িত দেশগুলো সাদা চামড়ার মোহে পড়ে গেলো- জাতে উঠতে হলে তাদের সংস্কৃতি ধারণ করতে হবে! ব্যস। পুঁজিবাদী সংস্কৃতির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে: পুঁজিবাদ প্রথমে অপ্রয়োজনীয় একটি বিষয়কে ‘প্রয়োজনীয় বিলাসিতা’ হিসেবে উপস্থাপন করে। এরপর তাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ বানিয়ে দেয়! আর এ কাজের জন্য প্রত্যেকের ঘরে ঘরে উপস্থিত পুঁজিবাদী মিডিয়ার মগজধোলাই যন্ত্র। ছোটবেলা থেকে এমনভাবে মগজধোলাই করা হবে যে একজন মানুষ হালাল-হারাম তো দূরে থাক, প্রয়োজনীয়তা ও অপ্রয়োজনীয়তার পার্থক্যই বুঝতে পারবে না। এভাবেই বিজাতীয় সংস্কৃতি শেকড় গেড়েছে আমাদের মনে-মস্তিষ্কে। শিরক ও একত্ববাদ, ইসলাম ও জাহেলিয়াতের তফাতই ঘুচিয়ে দিয়েছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.